আলিম ইসলামের ইতিহাস ১ম সপ্তাহের এসাইনমেন্ট উত্তর ২০২১ সমাধান

আলিম ইসলামের ইতিহাস ১ম সপ্তাহের এসাইনমেন্ট উত্তর ২০২১ সমাধান 

আলিম ইসলামের ইতিহাস ১ম সপ্তাহের এসাইনমেন্ট উত্তর ২০২১ সমাধান, ২০২১ সালের দাখিল পরীক্ষার এসাইনমেন্ট ইসলামের ইতিহাস, ২০২১ সালের দাখিল পরীক্ষার এসাইনমেন্ট ইসলামের ইতিহাস

অ্যাসাইনমেন্ট:  হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর মক্কী জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী: একটি প্রবন্ধ

শিখনফল: হযরত মুহাম্মদ (স.)-এর মক্কী জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলি

নির্দেশনা:
  • মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের কারণ।
  • আবিসিনিয়াতে হিজরতের গুরুত্ব।
  • মিরাজের পরিচয়,সংক্ষিপ্ত ঘটনা,মিরাজে র শিক্ষা ও উদ্দেশ্য।
  • মিরাজসম্পর্কে কাফেরদের বিভিন্ন অভিযােগ এবং নিরসন।

মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের কারণ:

এই আয়াত অবতীর্ণের পরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সাহাবীদের জন্য দেশান্তরের কথা চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি বহু পূর্ব থেকেই আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশির উদারতা এবং ন্যায়পরায়ণতা সম্পর্কে শুনে আসছিলেন। অধিকন্তু, সেখানে যে কারো প্রতি কোনো অন্যায়-অত্যাচার বা অবিচার করা হয় না, সে কথাও তিনি শুনেছিলেন। 
মুসলিমগণ যদি সেখানে গমন করে তাহলে সেখানে নিরাপদে থাকার এবং নির্বিঘ্নে ইসলাম পালনের সুযোগ লাভ করবে এই বিশ্বাস নবীজীর ছিল। এসব কিছু বিবেচনা করে তাঁদের জীবন ও ঈমানের নিরাপত্তাবিধান এবং নির্বিঘ্নে ইসলাম পালনের সুযোগ লাভের উদ্দেশ্যে আল্লাহর হুকুমে হিজরত করে আবিসিনিয়ায় গমনের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সাহাবীগণকে নির্দেশ প্রদান করলেন।

কঠিন পরিস্থিতির মুখে হিজরতের সূচনা:

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশ পেয়ে মুসলমানগণ ব্যাপকভাবে হিজরতের প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। কিন্তু এ হিজরত ছিল খুবই কঠিন। কেননা, এর আগেও একবার মুসলিমগণ হিজরতের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু সামান্য অসতর্কতার দরুণ সে সময় তাঁদের সে যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। এখন কাফেররা অতন্দ্র প্রহরীর মতো আরও সচেতন এবং যে কোনো মূল্যে এ ধরনের প্রচেষ্টা প্রতিহত করার ব্যাপারে তারা ছিল বদ্ধপরিকর।
কিন্তু আকাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য সাধনে সাফল্য লাভের ব্যাপারে কুরাইশগণের তুলনায় মুসলমানদের সচেতনতা ও ঐকান্তিকতার মাত্রা ছিলো অনেকগুণ বেশি। উপরন্তু নির্দোষ এবং ন্যায়নিষ্ঠ মুসলমানদের প্রতি ছিলো আল্লাহ তা’আলার বিশেষ অনুগ্রহ। যার ফলে কুরাইশগণের পক্ষ থেকে কোনো রকমের অনিষ্ট কিংবা প্রতিবন্ধকতা আসার পূর্বেই তাঁরা নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে গিয়ে পৌঁছলেন আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশির দরবারে।
এই হিজরতে সর্বমোট ৮২ কিংবা ৮৩ জন পুরুষ অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৮ কিংবা ১৯ জন মহিলা ঐ দলে ছিলেন। নাজ্জাশীর দরবারে পৌছে তারা হিজরতের কারণ তাঁর সামনে তুলে ধরলে বাদশাহ তাদেরকে মঞ্জুর করলেন। তাদেরকে নির্বিধ্নে সেখানে থাকার এবং দ্বীন পালনের আশ্বাস দিলেন।
এই হিজরতের পরেই আল্লাহ তা’আলা নাযিল করলেন,

“যারা নির্যাতিত হওযার পর আল্লাহর হুকুমে গৃহ ত্যাগ করেছে, আমি অবশ্যই তাদেরকে দুনিয়াতে উত্তম আবাস দেব এবং পরকালের পুরস্কার তো সর্বাধিক।” (আল কুরআন-১৬:৪১)

আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের নির্বিঘ্নে দিন যাপন:

এদিকে মুসলমানরা পালিয়ে গেছেন দেখে মক্কার কাফেররা খুবই ক্রোধান্বিত হল। হিজরতকারীদের ধরে আনার জন্য তারা তৎক্ষণাৎ একদল লোক জেদ্দা বন্দরের দিকে পাঠিয়ে দিল। কিন্তু তারা কাউকে না পেয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরে এল।

কুরাইশরা পরামর্শ সভা আহবান করল। এই সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে মুসলমাদেরকে আবিসিনিয়া থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য আব্দুল্লাহ ইবনে আবু রাবি’আ ও আমর ইবনে আ’সের সমন্বয়ে এক প্রতিনিধি দল বিভিন্ন উপঢৌকনসহ আবিসিনিয়ায় প্রেরিত হল।

তারা বাদশাহ নাজ্জাশীর দরবারে উপস্থিত হয়ে প্রত্যেক সভাসদকে উপঢৌকন প্রদান করে বাদশাহকে মুসলমানদের ব্যাপারে ক্ষেপিয়ে তুলতে চাইল। কিন্তু নাজ্জাশী তাঁর দূরদর্শিতার কারণে এই ছল-চাতুরি বুঝে ফেললেন। মুসলমানদের মধ্য থেকে সকলকে উপস্থিত করে তিনি কুরাইশদের অভিযোগ তাদের সামনে তুলে ধরলেন। রাসূলের আপন চাচাত ভাই জাফর ইবনে আবু তালেব(রাযিঃ) এর বিচক্ষণতা পূর্ণ বক্তব্যে বাদশাহ অভিভূত হলেন। এরপর তিনি কুরাইশদের দাবী বাদশাহ প্রত্যাখ্যান করলেন এবং প্রতিনিধি দলের শেষ প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলে তারা বিভ্রান্ত হয়ে মক্কায় ফিরে এল।

এভাবেই আবিসিনিয়ায় মুসলমানদের নির্বিঘ্নে দিন যাপন আরও ত্বারান্বিত হল এবং মুসলমানরা বাদশাহর শুকরিয়া আদায় করে সেখানে অবস্থান করতে লাগল।

আবিসিনিয়ায় হিজরতের গুরুত্ব:

মুসলমানদের আবিসিনিয়ায় হিজরতের গুরুত্ব ছিল সীমাহীন। এ হিজরতের ফলে ইসলাম ধর্ম আরবের গণ্ডি পেরিয়ে বর্হিবিশ্বে পরিচিতি লাভ করার সুযোগ আসে। আবিসিনিয়ার বাদশাহ নাজ্জাশী ইসলাম ধর্মের সত্যতা ও মাহাত্ম্য বুঝতে পারেন। তিনি নিপীড়িত মুসলমানদের আশ্রয় দান করে মহানুভবতার পরিচয় দেন। পরবর্তী সময়ে বাদশাহ নাজ্জাশী খ্রিস্টধর্ম ত্যাগ করে ইসলাম গ্রহণ করেন। রাসূল (স) তাঁর গায়েবী জানাযা পড়েছিলেন। এ হিজরতের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রমাণিত হয়। তা হল-

১. কোন অবস্থাতেই ইসলাম ত্যাগ না করে মুসলমানগণ সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত রয়েছে। মক্কা থেকে আবিসিনিয়ায় হিজরত কুরাইশদের মনে সে ধারণাই বদ্ধমূল হয়েছিল।

২. মুসলমানগণ ইসলামের জন্য যাবতীয় কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত, এমনকি নিজের জন্মভূমি থেকে হিজরতকে তারা আশীর্বাদ বলে মনে করে।

৩. তাঁরা আরো বুঝতে পারে যে, কুরাইশদের অত্যাচার ও নিপীড়নের হাত থেকে রেহাই পাবার জন্য বহির্বিশ্বে আশ্রয়ের ব্যবস্থা আছে।

৪. এ হিজরতই পরবর্তী বৃহত্তর হিজরতের অর্থাৎ মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের পথ উন্মুক্ত করে।

মিরাজের পরিচয়,সংক্ষিপ্ত ঘটনা,মিরাজে র শিক্ষা ও উদ্দেশ্য:

মহানবী হযরত মুহামদ (সা.)-এর জীবনে সংঘটিত সর্বাধিক আলোচিত ও বিস্ময়কর ঘটনাগুলোর মধ্যে মিরাজ অন্যতম। সূরা বনি ইসরাইলে একে ‘ইসরা’ বা রাত্রিকালীন ভ্রমণ হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। সূরা নজমেও এর বর্ণনা রয়েছে। এ ছাড়া হাদিস ও জীবনচরিত গ্রন্থাবলিতে এ ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ বিপুল সংখ্যক সাহাবী থেকে বর্ণিত হয়েছে। 

কাজেই মিরাজ বা ইসরা অকাট্য দলিল দিয়ে প্রমাণিত একটি বিষয়। আল্লাহ যেভাবে চেয়েছেন সেভাবে তাঁর বান্দাহকে (মহানবী সা.-কে) রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন এবং তাঁকে নিজের কিছু নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করিয়েছেন অন্তত এতটুকু কথা দ্বিধাহীনচিত্তে নিঃসঙ্কোচে মেনে নেয়া এবং বিশ্বাস করা পবিত্র কুরআন ও রিসালাতের প্রতি বিশ্বাসের অনিবার্য দাবি।

মূল ঘটনা: উম্মুল মু’মেনিন হযরত খাদিজা রা.-এর ইন্তিকালের পরে এবং আকাবার শপথের আগে মিরাজের ঘটনা ঘটে। সুনির্দিষ্ট সালের ব্যাপারে কিছুটা মতভেদ থাকলেও ঘটনাটি হিজরতের এক বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখ রাতে (২৬ তারিখ দিবাগত রাতে) সংঘটিত হয়েছিল এ ব্যাপারে অধিকাংশ ইমাম ও ঐতিহাসিকরা একমত। এ মহান রাতে মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাহ ও রাসূলকে তাঁর একান্ত সান্নিধ্যে নেয়ার অলৌকিক ব্যবস্থা করলেন, তাকে বেহেশত-দোজখসহ অসংখ্য নিদর্শন দেখালেন, তাঁর সাথে একান্তে কথা বললেন, তাঁর অন্তর নূর, প্রজ্ঞা ও হিকমতে ভরে দিলেন, মানবতার কল্যাণের নিমিত্তে তাঁকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও সূরা বাকারার শেষ তিন আয়াত হাদিয়া প্রদান করলেন। ইসরার বিবরণ: মিরাজের ঘটনার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন হযরত জিব্রাইল আঃ ও মিকাইল আঃ।

তারা ওই মহান রাতে উম্মে হানির  ঘরে গভীর ঘুমে নিদ্রিত মহানবী (সা.)-কে পবিত্র কাবা চত্বরে নিয়ে গেলেন। সেখানে তারা মহানবী (সা.)-কে মহাভ্রমণের উপযোগী করার লক্ষ্যে আল্লাহর হুকুমে আল্লাহর নির্দেশিত পন্থায় ‘সিনা চাক’ করলেন। এরপর তারা তাঁকে বোরাক নামক দ্রুতগামী বাহনে বায়তুল মুকাদ্দাসে নিয়ে গেলেন। সেখানে মহানবী (সা.) অনেক নবীর নামাযের জামাতে ইমামতি করলেন। সবাইকে সালাম করে এবার তিনি বোরাকে বা বিশেষ চলমান সিঁড়িতে আরোহণ করে বায়তুল মামুরসহ (ফেরেশতাদের কিবলা) অনেক কুদরত ও নিদর্শন দেখে সিদরাতুল মুনতাহায় উপনীত হলেন। 

মহান আল্লাহ যা বলার তা তাঁর বান্দাহকে বললেন, যা দেখার তা দেখালেন, যা দেয়ার তা দিলেন। মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোচ্চ সম্মান, আল্লাহর পরম ভালোবাসা, প্রভুর জন্য চরম ত্যাগের অনুভূতি, হিজরতের পরে একটি ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের হিম্মৎ ও যোগ্যতা, বান্দাহদের কল্যাণার্থে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং উম্মতে মুহাম্মদির জন্য মহান আল্লাহর বিশেষ করুণাসংবলিত বাণী সূরা বাকারার শেষ তিন আয়াত নিয়ে মহানবী (সা.) আল্লাহর নির্ধারিত উপায়ে সেই মহান রাতেই ফিরে এলেন এ পৃথিবীতে।

মিরাজের পর্যালোচনা: মিরাজ আত্মিক না শারীরিক? এ বিষয়ে সূরা বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতের বাচনভঙ্গি পর্যালোচনা করলে এবং বেশ কিছু হাদিস নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করলে খুব সহজেই সুস্পষ্ট হয় আকাবার শপথের আগের ইসরা ছিল শারীরিক। যারা মিরাজকে আকি বলেন তাদের জ্ঞানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বলা যায় এ ঐতিহাসিক ইসরার (রাত্রিকালীন ভ্রমণ) পাশাপাশি রাসূল (সা.)—এর জন্য একাধিক আত্মিক ভ্রমণ বিচিত্র কিছু নয়। বনি ইসরাইলের প্রথম আয়াতে ‘সুবহানা’ শব্দের মধ্যে যে বিস্ময় রয়েছে তা-ই মিরাজ শারীরিক হওয়ার কুরআনি যুক্তি।

কারণ স্বপ্নের ভ্রমণের মধ্যে তেমন কোনো কৃতিত্ব বা বিস্ময় নেই। তা ছাড়া বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রার সাথে সাথে এ ধরনের একটি বিস্ময়কর ভ্রমণ একেবারে অবিশ্বাস্য করার কোনো উপায় নেই। কিন্তু জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সব যুক্তির পরও মৌলিক সত্য হলো সেই আল্লাহ যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন, যিনি চন্দ্র, সূর্যসহ মহাবিশ্বের সব কিছু পরিচালনা করেন, সবার জন্য বিধান রচনা করেন, যিনি সব কিছুর উন্নতি ও বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করেন, যিনি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী, তিনি তার বান্দাকে একটি বিস্ময়কর ভ্রমণ করাবেন, গায়েবের কিছু বিষয় দিব্যদৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করাবেন এটা সেই মহান সত্তার জন্য খুবই সহজ একটি কাজ। 

হযরত আবুবকর রা. এই যুক্তিতেই শোনামাত্র বিনা বাক্য ব্যয়ে মিরাজকে বিশ্বাস করে ‘সিদ্দিকে আকবর’ হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছিলেন। যিনি আল্লাহকে সর্বশক্তিমান ইলাহ ও রব মানবেন এবং হযরত মুহামদ (সা.)কে রাসূল বলে মানবেন তার কাছে আখেরাত, বেহেশত, দোজখ, ফেরেশতা প্রভৃতি অদৃশ্য বিশ্বাসের মতোই মিরাজও একটি বিশ্বাস। অদেখা বিষয়গুলো যেমন আমরা রাসূল (সা.)-কে সত্যবাদী মেনে নিয়ে বিশ্বাস করেছি তেমনি মিরাজকেও বিশ্বাস করেছি।

রাসূল (সা.)-কে আল্লাহর নবী মানার কারণেই আমরা কুরআনকে আল্লাহর কিতাব বলে বিশ্বাস করছি। আর সেই কিতাব এবং সে কিতাব বাহকের হাদিসে মিরাজের সুস্পষ্ট বর্ণনা আছে। তাই মিরাজে বিশ্বাস করা কুরআন ও রিসালাতের প্রতি বিশ্বাসেরই অনিবার্য দাবি। 

একটি প্রশ্ন কেবল থাকতে পারে, তা হলো মহানবী তাঁর প্রভুকে কতটুকু দেখেছেন, তাঁর কতটা কাছাকাছি হয়েছেন। সূরা নজমের আলোচনায় বোঝা যায় মহানবী (সা.) হযরত জিব্রাইল আ.-কে তাঁর আসল সুরতে দেখেছেন। মহান আল্লাহর কতটা কাছাকাছি তিনি হয়েছেন এ বিষয়ে খুব ঘাঁটাঘাঁটি না করে সহজ সরল ঈমান পোষণ করা জরুরি।

আর তা হলো সসীম অসীমকে যতটা কাছ থেকে যতটুকু দেখতে পারে এবং মহান আল্লাহ যা কিছু দেখার সুযোগ দিয়েছেন মহানবী (সা.) তা-ই দেখেছেন। সূরা বনি ইসরাইলে এ সফরের উদ্দেশ্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘পবিত্র তিনি যিনি এক রাতে তার বান্দাহকে মসজিদে হারাম থেকে দূরবর্তী সেই মসজিদ পর্যন্ত নিয়ে গেলেন যার চারপাশকে তিনি বরকত দান করেছেন যেন তাকে নিজের কিছু নিদর্শন পর্যবেক্ষণ করাতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই সব কিছু দেখেন এবং শোনেন’ (বনি ইসরাইল-১)। পবিত্র এ আয়াতে বর্ণিত উদ্দেশ্যের সবটুকুই সফল হয়েছিল মহানবী (সা.)—এর মিরাজের মাধ্যমে।

মিরাজের সামাজিক প্রেক্ষাপট ও লক্ষ্য: রাসূল (সা.)-এর মক্কি জীবনের শেষভাগে আকাবার শপথের আগে সংঘটিত হয়েছিল মিরাজ। সে সময়ের ঘটনাপ্রবাহের সাথে মিরাজের রয়েছে একটি গভীর যোগসূত্র। রাসূল (সা.)-এর মক্কি জীবনের শেষভাগে কাফিরদের বিরুদ্ধতা তীব্র আকার ধারণ করে। একপর্যায়ে কাফেররা মহানবী (সা.)-এর খান্দানের সাথে সব ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। 

নবুওয়াতের সপ্তম বছরের এ অবরোধে আবু তালিব উপত্যকায় কার্যত মুসলমানরা বন্দী হয়ে পড়েন। নবুওয়াতের দশম বছর নবী (সা.)-এর কষ্টের জীবনসাথী এবং তার অর্থনৈতিক বড় অবলম্বন হযরত খাদিজা রাঃ ইন্তিকাল করেন। এ সময় মহানবী (সা.)-এর একটি বড় রাজনৈতিক অবলম্বন আবু তালেবও ইন্তিকাল করেন। আবু তালেব মুসলমান না হলেও কাফেরদের অত্যাচারের মুখে সব সময় অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতেন।

মানসিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবলম্বন হাতছাড়া হওয়ার পর রাসূল (সা.) ও সাহাবীদের ওপর কাফেরদের অত্যাচারের মাত্রা আরো বেড়ে গেল। মক্কার ভূমি মুসলমানদের জন্য ক্রমান্বয়ে সঙ্কীর্ণ হয়ে এলো। মদিনা থেকে একটি আশার আলো দেখা যাচ্ছিল, কিন্তু সে আলো ছিল বেশ ক্ষীণ। রাসূল (সা.) এক বুক আশা নিয়ে তায়েফে দাওয়াত দিতে গেলেন। কিন্তু তায়েফবাসী দাওয়াত তো গ্রহণ করলই না, বরং মহানবীকে মেরে রক্তাক্ত করল। 

এমনি একটি অবস্থায় যখন রাসূল (সা.)-এর জাগতিক সব অবলম্বন হাতছাড়া, যখন তিনি মক্কাবাসীদের ঈমান গ্রহণের ব্যাপারে আশাহত, যখন গোটা আরব তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ, যখন তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র চলছে, চরম দুঃখ-কষ্টে যিনি তার অন্তরে স্বস্তির পরশ বুলিয়ে দিতেন এবং আশার বাণী শোনাতেন সেই প্রিয়তমাও যখন পরপারে ঠিক তখন তাঁর মহান প্রভু সব দুঃখ-কষ্ট ভুলানোর জন্য এবং রিসালাতের কঠিন কাজ আরো সুদৃঢ় করার জন্য তাঁকে তাঁর পরম সান্নিধ্যে নেয়ার ব্যবস্থা করলেন। 

পরম প্রভুর নৈকট্য লাভে তিনি তৃপ্ত হলেন, অসংখ্য নিদর্শন দর্শনে তিনি হিকমত ও প্রজ্ঞায় পরিপূর্ণ হলেন। মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে এসে তিনি একটি আদর্শ সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণ এবং বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবেলায় ইস্পাতের মতো দৃঢ়তা প্রদর্শনের হিম্মৎ ও যোগ্যতা অর্জন করলেন। মহান আল্লাহর ভালোবাসায় তিনি সব কিছু করার মনোবল অর্জন করলেন। এ মিরাজের পরই আকাবার শপথের মাধ্যমে হিজরতের পটভূমি তৈরি হলো। মিরাজের পরে নাজিল হলো মিরাজ সম্পর্কিত বনি ইসরাইল সূরা। এ সূরায় ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক চৌদ্দ দফা নাজিল হলো। এ নির্দেশিকার আলোকে মহানবী (সা.)- সাহাবিদের গড়ে তুললেন এবং হিজরতের পর একটি আদর্শ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করলেন।
মিরাজের ফলাফল: রিসালাতে সন্দেহ পোষণকারীদের ছাঁটাই। ঈমানদারদের যাচাই। আল্লাহর নিদর্শনাবলি দর্শনে মহানবী (সা.) পরিপূর্ণ হিকমত ও প্রজ্ঞা লাভ করেন। বিরুদ্ধবাদীদের মোকাবেলায় পূর্ণ মানসিক শক্তি অর্জন। ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের প্রেরণা লাভ ও যোগ্যতা অর্জন। সব নবী-রাসূলের ওপর মহানবী (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব লাভ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর প্রতি ঈমান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে মিরাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। 
এতে ঈমানদারদের ঈমান আরো বেড়েছে। পক্ষান্তরে সন্দেহ পোষণকারীরা যুক্তির পেছনে দৌড়াতে দৌড়াতে মুসলিম জামায়াত থেকে আলাদা হয়ে গেছে। বস্তুত আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি অবিচল আস্থা ও বিশ্বাসহীন একটি গোষ্ঠী দিয়ে ইসলামী সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। আর এ জন্য মক্কি ও মাদানি জিন্দেগির সন্ধিক্ষণে ওই কঠিন সামাজিক প্রেক্ষাপটে এ পরীক্ষাটি একান্ত দরকার ছিল। জাগতিক সব অবলম্বন হাতছাড়া হওয়ার পর মহানবী (সা.) তাঁর মহান প্রভুর সান্নিধ্যে গিয়ে ভালোবাসার এক অভাবনীয় শক্তি লাভ করলেন। 
মহান আল্লাহর খেলাফত প্রতিষ্ঠার কঠিন কাজে মিরাজ মহানবী (সা.)-কে সাহস ও শক্তি জুগিয়েছে। প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং মহান আল্লাহর পরম সান্নিধ্য তার মনে ‘সাকিনা’ অবতীর্ণ করেছিল। ফলে হিজরতের সময় সাওর গুহায় যখন তিনি ছিলেন দু’জনের একজন, বদর প্রান্তরে যখন তিনি তিনশ’ তেরো জন সৈন্য নিয়ে কাফেরদের বিশাল বাহিনীর মোকাবেলা করেন, তাবুকে রোম পরাশক্তির বিরুদ্ধে যখন তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন তখনো তিনি ছিলেন অনড়, অটল, ভাবনাহীন। তার এ চারিত্রিক দৃঢ়তায় মিরাজের ভূমিকা অপরিসীম। তাই মিরাজ একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিস্ময়কর ঘটনা। মক্কি জীবনের শেষভাগের এ ঘটনার ফল ছিল সুদূরপ্রসারী।
মিরাজের শিক্ষা: মিরাজ মহান আল্লাহর অপার মহিমা ও কুদরতের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। মিরাজ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শ্রেষ্ঠত্ব ও উচ্চতম মর্যাদার সাক্ষ্য বহন করে। মিরাজেও রাসূল (সা.) আমাদের কল্যাণের কথা ভেবেছেন। রাসূল (সা.)-এর এ উদারতা আমাদেরকে তাঁর ভালোবাসায় উজ্জীবিত করে। মিরাজ মহাকাশ গবেষণায় এক নবদিগন্ত উন্মোচিত করে। 
মিরাজের ঘটনার বিবরণ সংবলিত সূরা বনি ইসরাইলের তৃতীয় ও চতুর্থ রুকুতে বর্ণিত ১৪ দফার শিক্ষা ও মিরাজ-উত্তর রাসূল (সা.)-এর কর্মকৌশল আমাদেরকে একটি আদর্শ কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রেরণা জোগায়। মিরাজের সর্বোৎকৃষ্ট দান হলো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ। নামাজের মাধ্যমে বান্দাহ আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। নামাজের মাধ্যমে চরিত্র সংশোধিত হয় এবং যথাযথভাবে নামাজ কায়েমের মাধ্যমে একটি ইসলামী সমাজের ভিত্তি রচিত হয়। তাই নামাজের ব্যাপারে সব গাফিলতি ঝেড়ে ফেলে নামাজে নিষ্ঠাবান হওয়া মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

মিরাজসম্পর্কে কাফেরদের বিভিন্ন অভিযােগ এবং নিরসন:

আল্লাহ তাআলা রাসুলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে ২৬ রজব দিবাগত রাত অর্থাৎ ২৭ রজব তাঁর পবিত্র দিদারে উবর্ধাকাশে নিয়ে যান। একই রাতে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস। সেখান থেকে সপ্তম আসমানের ওপরে। সেখান থেকে আল্লাহর ইচ্ছা মাফিক আরো অনেক ওপরে নিয়ে একান্ত দিদার করেন।
অথচ তৎকালীন সময়ে শুধু মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস যেতেই সময় লাগত এক মাসেরও অধিক। অবিশ্বাস কাফের সম্প্রদার বিশ্বনবির এ ঘোষণা শুনে হাসি-ঠাট্টা ও বিদ্রোপ শুরু করলো।
একদল হজরত আবু বকরের কাছে জানতে চাইল, কেউ যদি মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে সেখান থেকে সপ্তম আকাশে যেতে চায়; তবে কি তা এক রাতে সম্ভব। হজরত আবু বকর জানতে চাইলেন, কে বলেছে এ কথা? তারা বলল, ‘তোমার নবি-ই তো এ কথা বলছে।
হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু তাদের কাছে প্রিয়নবির কথা শোনামাত্র-ই বললেন, আমি বিশ্বাস করি এবং তা সম্ভব। আর এ কারণেই হজরত আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহু ‘ছিদ্দিক’ উপাধি লাভ করেছিলেন।
হজরত আবু বকরের কাছে পাত্তা না পেয়ে কাফের সম্প্রদায় এবার প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে গিয়ে বায়তুল মুকাদ্দাসের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে প্রশ্ন করা শুরু করল।
তারা বলল, আপনিতো বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়েছেন- প্রিয়নবি বললেন, ‘হ্যাঁ’। তখন তারা বলল, বলুনতো বায়তুল মুকাদ্দাসের কয়টা সিড়ি? কয়টা জানালা, কয়টা দরজা ইত্যাদি প্রশ্নবানে প্রিয়নবিকে জর্জরিত করতে লাগল।
যদিও কেউ কোথাও গেলে সেখানের কয়টা দরজা, কয়টা জানালা, কয়টা সিড়ি এসব গণনা করতে যায় না। তথাপিও প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কাফের অবিশ্বাসীদের প্রশ্নে পেরেশান হয়ে গেল। তিনি ভাবলেন, আজ যদি তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে না পারি, তাহলে ওরা আমাকে মিথ্যুক সাব্যস্ত করবে।
হাদিসে পাকে প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘তখন আমার এত বেশি পেরেশানি হলো যে, ঐ রকম পেরেশানি আমার আর কখনো হয়নি। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন-
فَجَلَّى اللهُ لِى بَيْتَ الْمَقْدسِ فَطَفِقْتُ اُخْبِرهُمْ عَنْ ايَاتِه وَ اَنَا اَنْظُرُ- مسلم
অর্থাৎ অতঃপর আল্লাহ পাক বায়তুল মুকাদ্দাসকে আমার চোখের সামনে তুলে ধরলেন, আর তারা যা জিজ্ঞাসা করছিল, আমি দেখে দেখে গণনা করে করে তার উত্তর দিয়ে যাচ্ছিল। সুবহানাল্লাহ!
এ রকম জাজ্বল্যমান প্রমাণ দেয়ার পরও অবিশ্বাসী সম্প্রদায় প্রিয়নবির প্রতি ঈমান আনেনি। আল্লাহ তাআলা তাদের ঈমানের মতো নেয়ামতের তাওফিক তাদেরকে দেননি।
সুতরাং বুঝাগেল মেরাজ যেমন তাওহিদ, রেসালাতের সত্যায়নের এক বিশাল দলিল। আবার তা মুসলিম উম্মাহর জন্য সেরা পুরস্কার প্রাপ্তির বিষয়ও বটে। তাছাড়া ঈমানের মতো অসামান্য নেয়ামতও মুমিন বান্দার জন্য সেরাদান।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে প্রিয়নবির প্রতিটি জিনিসের প্রতি ঈমান রাখার এবং আল্লাহর বিধান বাস্তবায়নের তাওফিক দান করুন।

আপনি যদি এই post পছন্দ করেন বা কিছু শিখে থাকেন বলে মনে হয়, তবে দয়া করে এই পোস্টটি Social Networks যেমন Facebook, Twitter এবং অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলিতে শেয়ার করুন।

ঘরে বসে অনলাইনে কিভাবে টাকা উপার্জন করবেন ফ্রীতে –How to make money online from home CLICK HERE IT’S FREE 

Leave a Reply